ঘুরে এলাম উত্তরাখণ্ড, যাকে বলা হয় অনেকটা বরফের রাজ্য। উত্তরখণ্ড অনেক বড় একটা রাজ্য। আমাদের লক্ষ্য ছিল অলি। যদিও যেভাবে প্লান করেছিলাম, বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে ঠিক সেভাবে হয়নি।

ঢাকা – কলকাতা – দিল্লী – আগ্রা – দিল্লী – দেরাদুন – মুসৌরী – হরিদ্বার – হৃষীকেশ – উখিমঠ – চোপতা – সারি ভিলেজ – জোশীমঠ – অলি – রুদ্রপ্রয়াগ – হরিদ্বার – দিল্লী – কলকাতা – ঢাকা।

ঢাকা – কলকাতা – ঢাকাঃ Indigo ফ্লাইট, রিটার্ন সহ পড়েছে ৮৯০০/- বাংলাদেশী টাকা, কেটেছি ClearTrip থেকে, কেটেছিলাম অক্টোবরে।

কলকাতাঃ আমি এক বাসায় হোম স্টে করি, ১০০০/- প্রতি রাত, লাঞ্চ বা ডিনার ১২০-১৮০/- পড়ে

কলকাতা – দিল্লীঃ শিয়ালদহ রাজধানী এক্সপ্রেস, 3A ২৪৪৫/- হাওড়া রাজধানী এবং দুরন্ত এর ভাড়া একটু বেশি।

দিল্লীঃ ক্লক রুমে ব্যাগ রেখে হালকা ঘোরাঘুরি।

দিল্লী – আগ্রাঃ আন্দামান এক্সপ্রেস, ভাড়া ১৪০/-, SL

আগ্রাঃ 
হোটেলঃ www.oyorooms.com/41466-budget-oyo-18641-hotel-rashm… ভাড়া ৮৬৫/- তাজমহলের ইস্টার্ন গেটে, রাতের ভিউ অসাধারণ। রাতের বেলা তাজমহলের গেট পর্যন্ত হেঁটে ঘুরে আসতে পারবেন। 
আগ্রা ভ্রমনঃ অটো ভাড়া ১২০০/- ফতেহপুর সহ সব ঘুরিয়ে এনেছে, ৭৬১৮৪৬২৫৭৩

আগ্রা – দিল্লীঃ পাঞ্জাব মেইল, ভাড়া ১৭০/-, SL

দিল্লীঃ
হোটেলঃ www.oyorooms.com/3211-budget-oyo-2373-hotel-d-inn-d… ভাড়া পড়েছে ৮০০/- (রিকমেন্ডেড নয় একদমই, OYO তে এই প্রথম কোন বাজে হোটেল পেলাম) 
দিল্লী ভ্রমনঃ মেট্রো ডেইলি কার্ড করে। ১৫০/- টাকা খরচ।

দিল্লী – দেরাদুনঃ নন্দা দেবী এক্সপ্রেস, ভাড়া ৫৯৫/- 3A

দেরাদুন থেকে পুরো উত্তরাখণ্ড এর জন্য ৯ দিন আমাদের সাথে গাড়ী ছিল, ৬ সিটের ইনোভা, ভাড়া ৩০৯৭৫/- বিল না নিলে ৫% কম পড়ত। ড্রাইভারঃ ৯৬৯০৮০৭৪৫০ (রাজু), অপারেটর কিশোর ট্রাভেলস – ৯৯২৭৭১২০৯০। আমরা শুধু গাড়ীটাই এদের কাছ থেকে নিয়েছিলাম। সরাসরি ড্রাইভারের সাথে যোগাযোগ করলে আরো কমে পাওয়া যেত।

দেরাদুন – মুসৌরীঃ গাড়ী।

মুসৌরী হোটেলঃ www.oyorooms.com/44760-budget-oyo-22884-hotel-shing… ভাড়া ৫০৫/-

হরিদ্বার হোটেলঃ www.oyorooms.com/16989-budget-oyo-10150-sun-hotel-h… ভাড়া ৫১৫/-

উখিমঠ হোটেলঃ www.devbhumihotel.com ভাড়া ১০০০/-

সারি ভিলেজঃ অঞ্জলি হোম স্টে, ভাড়া ৮০০/-

জোশীমঠ হোটেলঃ www.dronagirihotel.com/, ভাড়া ৩০০০/-

জোশীমঠ – অলিঃ কেবল কার ৭৫০/- এবং চেয়ার লিফট ৩০০/- (রিটার্ন সহ)

অলি হোটেলঃ gmvnl.in/newgmvn/index.aspx ভাড়া ৪১৩০/-

রুদ্রপ্রয়াগ হোটেলঃ www.hotelpushpdeepgrand.com/, ভাড়া ১০০০/-

হরিদ্বার হোটেলঃ www.oyorooms.com/16989-budget-oyo-10150-sun-hotel-h… ভাড়া ৭৮০/-

হরিদ্বার – দিল্লী নন্দা দেবী এক্সপ্রেস, ভাড়া ৫৯৫/- 3A

দিল্লী হোটেলঃ হোটেল স্টার ভিলা, ৮০০/-

দিল্লী – কলকাতাঃ শিয়ালদহ রাজধানী এক্সপ্রেস, 3A ২৩৩১/- হাওড়া রাজধানী এবং দুরন্ত এর ভাড়া একটু বেশি।

হৃষীকেশ থেকে বের হবার পর থেকেই খাবার দাম একটু বেশি, এছাড়া স্বাদ অনেকের কাছে ভাল নাও লাগতে পারে।

বেশির ভাগ জায়গায়ই আমি OYO তে হোটেল বুকিং দিয়েছি, বেশ কম দামে অনেক ভাল মানের হোটেল পেয়েছি।

১৩.০১ঃ সন্ধ্যার ইন্ডিগো ফ্লাইটে কলকাতা যাই। আমি প্রতিবার গিয়ে এক বাসায় হোম স্টে করি। অনেকেই বাসাটার ঠিকানা জানোতে চান। বাসাটা আসলে প্রপার কলকাতা থেকে একটু দূরে। এলাকার নাম, জোকা, ঠাকুরপুকুর, নিউমার্কেট আসতে উবারে ১-১.৫ ঘণ্টার মত লাগে। আমার কলকাতা তেমন কাজ থাকেনা, পাশাপাশি ওনারা আমার রিলেটিভ এর মত হয়ে গেছে বিধায় প্রতিবার ওখানেই উঠি।

১৪.০১ঃ ডলার ভাঙ্গাতে গিয়ে দেখি, ওনার দোকান বন্ধ। পরে ফোন করলে বাসা থেকে টাকা এনে দেয় আমাকে, ভাল মানুষ। এরপর কিছু ওষুধ কিনে, হালকা হাঁটাহাঁটি করে বাসায় চলে আসি।

১৫.০১ঃ শিয়ালদহ থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে করে দিল্লীর উদ্দেশ্যে যাত্রা। শিয়ালদহ রাজধানীর ভাড়া হাওড়া রাজধানী বা দুরন্ত এর চেয়ে একটু কম, খাবার পরিমাণ এবং কোয়ালিটি ও আগের চেয়ে খারাপ মনে হল।

১৬.০১ঃ ১১ টার দিকে দিল্লী নেমে, লাগেজ ক্লক রুমে দিয়ে দিলাম। এরপর দিল্লী স্টেশনের আশেপাশে একটু ঘোরাঘুরি করে লাঞ্চ সেরে নিলাম। এরপর ক্লক রুম থেকে লাগেজ নিয়ে আগ্রার ট্রেনে চেপে বসলাম।

সন্ধ্যা নাগাদ আগ্রা পৌঁছে, ৮টার দিকেই হোটেলে চেক-ইন করলাম। হোটেল ছিল তাজমহলের ইস্টার্ন গেটে। হোটেলের সামনের রাস্তাটাই তাজমহলে যাবার রাস্তা। রাতের বেলা অসাধারণ লাগে। দুই ধারে খুব সুন্দর লাইটিং করা, একদম ঝকঝকে পরিষ্কার। আমরা ডিনার সেরে ঐ রাস্তা ধরে একদম তাজমহলের গেট পর্যন্ত হেঁটে এসেছিলাম। ওখানকার সিকিউরিটি এর সাথে খানিক গল্প কর আসলাম। তখন জানলাম যে, পূর্নিমার রাতে তাজমহলের ভিতরে ঢোকা যায়। এর জন্য আলাদা টিকিট কেটে নিতে হয়। পূর্নিমা যদি শুক্রবার হয়, তবে শনিবার রাতে খোলা থাকে। চাঁদের আলোয় তাজমহল কেমন দেখাবে, ভাবতেই আলাদা অনুভূতি হয়। আবার হেঁটে আমরা হোটেলে ফিরে আসি। হোটেলের রেস্টুরেন্ট রুফটপে, ওখানেও সুন্দর করে লাইটিং করা। পরদিন ঘোরার জন্য অটো ভাড়া করে রেখে শুয়ে পড়লাম।

১৭.০১ঃ ভোর ৫টায় উঠে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পরলাম। তাজমহলের গেটে আমাদের হোটেল থেকে যেতে ৮-১০ মিনিটের মত লাগে। গিয়েই টিকিট কেটে নিলাম। সার্ক মেম্বার হিসেবে টোটাল ভাড়া পড়বে ৭৪০/- আর আপনি যদি মেইন বিল্ডিং এ না যান তবে ৫৪০/-। এই টিকিট টা রেখে দিবেন, কারণ এই টিকিট দেখালে আগ্রার অন্য কোথাও আপনাকে সার্ক ট্যাক্স দিতে হবে না, নরমাল টিকিট কেটেই ঢুকতে পারবেন।

তাজমহল থেকে সানরাইজ দেখার মজা অনন্য। তাজমহল খুবই ভালভাবে দেখতে হলে আসলে সারাদিন লাগে, অনেক বড়। কিন্তু আমাদের হাতে তো সময় নেই। আমরা সাড়ে ৯টার দিকে বের হয়ে হোটেলে ফিরে চেক আউট করে, ওদের ক্লক রুমে লাগেজ রেখে, আগের ঠিক করা অটোতে করে ফতেহপুর চলে গেলাম।

জেনে রাখা ভাল, তাজমহল শুক্রবার বন্ধ থাকে। তবে এদিন জুমার নামাজ পড়তে পারবেন। তাই ঘুরতে গেলে, এটা মাথায় রাখবেন।

ফতেহপুর সিক্রি আরেক বিশাল জায়গা। এখানে চিশতীর দরবার আছে। এখানে এসে জানলাম দ্বিন-এ-এলাহি এর মানে কি আর কিভাবে শুরু। এখানে তিন ধর্মের তিন রাণীর মহল। ঘুরে দেখতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। এরপর চিশতীর দরগায় গিয়ে কিছুটা সময় কাটালাম। খুঁজে খুঁজে এক কাওয়ালি গ্রুপ পেলাম, ওদের থেকে কয়েকটা গান শুনে নিলাম।

চিশতীর দরগাতে অনেকে কাপড় বা সুতো গিট দিয়ে আছে। কথিত আছে, এখানে কেউ কিছু চাইলে নিরাশ হয় না। ক্যাটরিনা কাইফ নাকি প্রতি বছর এক বার করে এখানে আসেন।

দুপুরের দিকে ওখান থেকে আগ্রা ফিরে, লাঞ্চ সেরে আগ্রা ফোর্ট, বেবি তাজমহল এবং ইতমাদ-উদ-দৌলার টম্ব দেখে হোটেল থেকে লাগেজ নিয়ে সোজা স্টেশনে দিল্লীর ট্রেন ধরার জন্য। রাতে দিল্লী ফিরে, সোজা ঘুম।

আগ্রা নিয়ে এই গ্রুপে অনেক পোস্ট আছে বিধায়, ডিটেইলসে গেলাম না।

১৮.০১ঃ সকালে উঠেই চলে গেলাম মেট্রো স্টেশন। গিয়ে একটা ডেইলি কার্ড করিয়ে নিলাম। ২০০ টাকা নিবে, কিন্তু কার্ড যখন রিটার্ন দিবেন, তখন ৫০/- ফেরত দিবে। এর বিনিময়ে সারাদিন যত খুশি তত ভ্রমণ করা যায়।

দিল্লী ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমি একটা প্লান ফলো করেছি। অনেকটা এরকমঃ

নিউ দিল্লী স্টেশন থেকে সেন্ট্রাল সেক্রেটেরিয়েট ষ্টেশনঃ ইন্ডিয়া গেট, প্রেসিডেন্ট ভবন, পার্লামেন্ট।
সেন্ট্রাল সেক্রেটেরিয়েট ষ্টেশন থেকে কালকা জি মন্দির স্টেশনঃ লোটাস টেম্পল 
কালকা জি থেকে জরবাগঃ হুমায়ুন’স টম্ব 
জরবাগ থেকে কুতুব মিনারঃ কুতুব মিনার 
কুতুব মিনার থেকে চাঁদনি চকঃ রেড ফোর্ট, চাঁদনি চক, জামে মসজিদ 
চাঁদনি চক থেকে নিউ দিল্লী স্টেশনঃ হোটেল।

জামে মসজিদ এর আশেপাশে কিছু খুবই ভাল মানের বিরিয়ানি পাওয়া যায়। আমি করিমস থেকে নিয়েছিলাম। জানিনা ঠিক কেন, হতে পারে আমার রেড মিটের প্রতি আগ্রহ অনেক কম বিধায় বিরিয়ানি আমার কাছে তেমন ভাল লাগে নি।

চাঁদনি চক কেনাকাটার জন্য বিখ্যাত। চাইলে পাহাড়গঞ্জ থেকেও কম দামে কেনাকাটা করতে পারেন।

হোটেলে ফিরে চেক আউট করে স্টেশনে, রাত ১১.৫০ এ দেরাদুনের ট্রেন।

১৯.০১ঃ সকালে স্টেশনে নেমে চা খেতে খেতেই আমাদের গাড়ী হাজির। গাড়ীতে করে যাত্রা শুরু মুসৌরী। আর এখান থেকেই আমাদের প্লান বিগড়ানো শুরু। মুসৌরীতে আমাদের থাকার কোন প্লান ছিল না। সারাদিন ঘুরে রাতে হরিদ্বার গিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু মুসৌরী যেতে যেতেই আমার এসিড ফর্ম করল, বমির উদ্রেক হল। গাড়ীতে বসেই ঠিক করলাম একটা হোটেল নেই, কিছুটা রেস্ট নিয়ে এর পরে বের হব। OYO তে বুকিং দিয়ে হোটেলে চলে গেলাম। জানতাম না বিধায়, হোটেল বুকিং দিয়েছি মল রোডে, যেখানে ট্যাক্সি লাইসেন্সের গাড়ী ঢুকতে দেয় না। ফলে কিছুটা হেঁটে যেতে হল। একটু রেস্ট নিয়ে আমরা ১১টার দিকে বের হই।

You may also read:  ভূস্বর্গের পথে - লাদাখ কাশ্মীর

কোথাও ঘুরতে গেলে আমার পছন্দ একটু আনকমন ও নিরিবিলি জায়গা। লেক, মার্কেট বা পার্ক আমার ভাল লাগে না। সেই মোতাবেক প্লান করে, আমরা ঘুরে এলাম কেম্পটী ফলস, SOS Childrens’ village (এখানে খুব সুন্দর একটা মনেস্ট্রি আছে), হ্যাপি ভিলেজ, ক্লাউড এন্ড, জর্জ এভারেস্ট হাউজ এবং শেষে গানহিল পয়েন্ট ও লাল টিব্বা।

ক্লাউড এন্ড এবং জর্জ এভারেস্ট হাউজ পাশাপাশি। গাড়ী পুরোটা যায় না রাস্তা খারাপ হবার কারণে। প্রায় ২ কিমি আপহিল হেঁটে পৌঁছাতে হয়। আপনি এখানেই সারা দিন কাটাতে পারবেন। ট্রেক করে সর্বোচ্চ পিকে যেতে পারবেন।

লাল টিব্বা পর্যন্ত ট্যাক্সি লাইসেন্সের গাড়ী যেতে পারে না। পিকচার প্যালেস থেকে লোকাল গাড়ী ভাড়া নিতে হয়। ৮৫০/- পড়ে ভাড়া, রিটার্ন সহ। লাল টিব্বা যাবার পথে গানহিল পয়েন্ট দেখে আসতে পারেন। লাল টিব্বা তে আপনি উইন্টার লাইন দেখতে পারেন। পৃথিবীর খুবই অল্প কিছু জায়গা থেকে উইন্টার লাইন দেখা যায়। তবে আকাশ পরিষ্কার না থাকলে ততটা ভাল দেখা যাবে না।

লাল টিব্বা দেখে হোটেলে চলে গেলাম, যাবার আগে মার্কেটে একটু ঘুরে, কিছু লোকাল খাবার চেখে দেখলাম।

২০.০১ঃ সকালে উঠে গাড়ী নিয়ে রওয়ানা দিলাম হরিদ্বার। হোটেলে চেক-ইন করতে করতে ১১টা বাজল। দুপুরে লাঞ্চ করে বের হলাম ঘুরতে। হরিদ্বার কে বলা হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হরির দুয়ার। এখানে হাজার হাজার মন্দির আর আশ্রম আছে। আমরা সন্ধ্যের আগে যতগুলো পারি দেখে নিলাম। এমন একটা মন্দির এর ভিতরে থাকাকালীন একটা গরু এসে আমাদের গাড়ী ঢুস দিয়ে দরজা বাঁকা করে ফেলল ভিতরের দিকে। ড্রাইভার আমাদের সন্ধ্যার আগেই হরি কি পুরি তে নামিয়ে দিয়ে গাড়ী ঠিক করাতে চলে গেল। হরি কি পুরি হল হরিদ্বারের প্রধান আকর্ষন। ভানারসীর পরে ভারতে সব চেয়ে বড় গঙ্গা আরতি এখানে হয়। সন্ধ্যার সাথে সাথেই সব জায়গা লোকে ভরে যায়। তাই ভাল ভাবে দেখতে হলে আগে যাওয়া ভাল, এতে সামনে বসতে পারা যায়। দেখার মত একটা আয়োজন হয় এখানে।

হরিদ্বারে একটা মনসা মন্দির আছে পাহাড়ের উপড়ে, যেটা হরিদ্বার থেকে দেখা যায়, কিন্তু যেতে অনেকটা সময় লাগে। কিন্তু আপনি যদি যেতে পারেন, যাওয়াটা সার্থক হবে। স্থাপনাটা খুবই সুন্দর, পাশাপাশি পাহড়ের উপর থেকে হরিদ্বার দেখতেও অনেক ভাল লাগবে। এছাড়া হরিদ্বারে রাস্তাঘাটে ছোটো বড় অনেক শিব মুর্তি দেখতে পাবেন।

আরতি শেষে আরো কিছুক্ষণ ঘুরে, কিছু লোকাল ফুড খেয়ে হোটেলে চলে আসলাম।

২১.০১ঃ সকালে নাস্তা করেই বের হয়ে গেলাম। এদিন আমাদের প্লান ছিল চোপতা থাকব রাতে, পরদিন তুংগনাথ ট্রেক করব। তাই সকাল সকালই বের হয়ে প্রথমে হৃষীকেশ চলে গেলাম। লক্ষণ ঝুলা ব্রিজের গোড়াতে নেমে, ব্রিজ পাড় হয়ে ভিতর থেকে হেঁটে এসে রাম ঝুলা ব্রীজ থেকে আবার গাড়ীতে উঠলাম।

রাম ঝুলা এবং লক্ষণ ঝুলা দুটিই ঝুলন্ত ব্রীজ, কিন্তু বেশ মজবুত আর এর উপর দিয়ে বাইক ও চলে। হেঁটে আসার রাস্তাটা আসলে ইয়োগা গ্রাম। এখানে কয়েকশ ইয়োগা সেন্টার আছে। সারা দুনিয়া থেকে হাজার হাজার মানুষ ইয়োগা করতে এখানে আসে। পরিবেশটা অনেক ঠাণ্ডা। আপনার কাছে মনে হবে, আপনি এমন এক জায়গায় আসছেন যেখানে দুনিয়া মোটামুটি থেমে গেছে এবং মানুষের কোন কিছু নিয়ে কোন টেনশন নেই। সুযোগ হলে আমি সাত দিনের জন্য ইয়োগা গ্রামে থাকব এক সময়।

হৃষীকেশ থেকে বের হয়েই শুরু লম্বা জার্নি। সাড়ে দশটার দিকে আমরা ওখান থেকে বের হই। ঘণ্টা দুই যাবার পর, টায়ার পাংচার হয়। ড্রাইভার গাড়ী সাইড করে টায়ার চেঞ্জ করে। প্রথমে গরু, এরপরে টায়ার – তখনো বুঝিনি আরো কি আছে সামনে!

১টার দিকে দেবপ্রয়াগ পৌছাই। এখানে গঙ্গার উৎপত্তি। ভাগীরথী আর অলকানন্দা নদী এখানে মিলে গঙ্গা তৈরী হয়েছে। ৩টার দিকে চলে যাই শ্রীনগর। সেখানে গিয়ে শুনতে পারি যে ওয়েদার রিপোর্ট উলটে পালটে চোপতার ঐদিকে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। আর বৃষ্টি মানেই হল স্নোফল। আমরা এমন সময় স্নোফল আশা করিনি, অন্তত ওয়েদার রিপোর্ট অনুসারে। শ্রীনগর লাঞ্চ করে রুদ্রপ্রয়াগ পৌছালাম সন্ধ্যার একটু আগে। সেখান থেকে আমাদের জানানো হল চোপতার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে অলরেডি। সারাদিনে নাকি অনেক স্নোফল হয়েছে। রাতে সেখানেই থেকে যেতে বলল।

আমরা আলোচনা করে ঠিক করলাম গিয়ে দেখি, যেতে না পারলে ফিরে আসব। সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমরা যখন উখীমঠের কাছাকাছি, তখন বেশ ভাল বৃষ্টি হচ্ছে। ড্রাইভার বলল, এমন হলে ল্যান্ডস্লাইড হতে পারে, অনেক রিস্ক হবে। তখন ঠিক করলাম, তাহলে আজ রাতে উখীমঠে থেকে যাই। কাল সকালে চোপতা যাবার চেষ্টা করব। এই ভেবে রাতে উখীমঠ একটা হোটেলে থাকলাম।

২২.০১ঃ সকালে উঠেও সেই বৃষ্টি থামার কোন সম্ভাবনা নেই। তবু ৮টার দিকে বের হয়ে গেলাম। চোপতা থেকে ৯ কিমি আগে থেকেই আমরা স্নোফল পাওয়া শুরু করলাম। একই সাথে আনন্দ আর টেনশন শুরু হয়ে গেল। কিছুদূর যাবার পরেই রাস্তা পুরো জনমানবশূন্য হয়ে গেল। রাস্তার দুই ধারে বরফ পড়ে আছে। রাস্তার মাঝে নতুন বরফ যা এখন পড়তেছে। চোপতার ৫ কিমি আগে গাড়ী স্কিড করা শুরু করল এবং একটু পরে আর গাড়ী আগালোই না। রাস্তায় তখন প্রায় ৩-৪ ইঞ্চি বরফ। আমরা গাড়ী থেকে নেমে যা বুঝলাম, এর মধ্যে যাওয়া কোন ভাবেই সম্ভব না। একবার হেঁটে যেতে চাইলাম, কিন্তু ড্রাইভার বলল গিয়ে যদি ওখানে কোন হোটেল খোলা না পান, তাহলে কিন্তু বিপদ হবে। আর এমন সময় হোটেলের লোকজনও নিচে চলে আসে।

তখন আমরা ঠিক করলাম তাহলে সারি ভিলেজে যাই এখনই। এখানে যাবার কথা ছিল আজ রাতে, ট্রেক করে ফিরে। কিন্তু গাড়ী তো ঘুরানো যাচ্ছে না। তখন আমরা নিজেরা নেমে পড়লাম রাস্তার বরফ পরিষ্কার করতে। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে গাড়ীর আশেপাশের সমস্ত বরফ পরিষ্কার করলাম। এর পরে গাড়ী অনেক সময় নিয়ে ঐটুকু রাস্তার মধ্যে ঘুরানো হল। তখনই সারি ভিলেজে চলে গেলাম। সারি ভিলেজ ওখান থেকে কাছেই, ৩০ মিনিটের মত লাগল। একটু নিচে নেমে আলাদা একটা রোড। সারি ভিলেজে ঢুকে দেখি পুরো সাদা একটা গ্রাম। যতদূর চোখ যায়, শুধু সাদা আর সাদা। আমরা ১২ টার মধ্যেই হোম স্টে তে উঠে গেলাম। এটার ঠিকানা উখীমঠ হোটেল থেকে দিয়েছিল আমাদের।

এখানে কিচেন হল ছাদে, আর রুম হল নিচে। হোম স্টে বললেও আসলে পুরোপুরি হোম স্টে না। আমরা ঠিক করলাম আজ যেহেতু কোন কাজ নেই, পিকনিক টাইপ কিছু করে সময় কাটাই। আমাদের মধ্যের এক বীরপুরুষ নারী সদস্য Agdum Bagdum ঠিক করল সে-ই আজকে দুই বেলা রান্না করলাম। দেরাদুন আসার পড় থেকে খাওয়া নিয়ে সবারই একটু সমস্যা হচ্ছিল। এরা সব আইটেমেই একই মসলা দেয়, সেটাও একটু অন্য রকম স্বাদের।

আমাদের সাথে কলকাতা থেকে এক ভাই Sarif Ansari জয়েন করেছিল, উনি আবার আমাদের দেশের জামাই – মানে বিয়ে করেছে আমাদের দেশে। উনি এসে বলল ভাই চলেন দেওরিয়াতাল ট্রেক করে আসি। আমি বলি এর মধ্যে? হোটেলের মালিক বলল, প্রায় হাঁটু সমান বরফ পাবেন। তবে যেহেতু কাল রাতে পড়েছে, শরীরে কুলালে যেতে পারবেন কারণ এখনো জমেনি। আমি বললাম, ভাই আমার এমনিতেই কোল্ড এটাক হয়, আমি যাব না। উনি একাই যেতে চাইলেন। তখন বললাম তাইলে অন্তত গাইড নিয়ে যান, রাস্তা তো খুঁজে পাবেন না।

You may also read:  হিমালয় কন্যার প্রেমে

এক হাজার টাকায় গাইড ভাড়া করা হল। গাইড আর শরীফ ভাই দুজন মিলে ঘুরে এল দেওরিয়াতাল লেক, প্রায় ৫ ঘণ্টার মত লেগেছে গিয়ে ফিরতে। সেখানে প্রায় কোমর সমান বরফ ছিল, ওনারা লিটারেলি ঠেলে ঠেলে এগিয়েছে। হ্যাটস অফ টু দেম!

এদিকে আমরা হোটেল মালিককে বললাম চিকেন আনাতে, রাতে বার-বি-কিউ করব। দুপুরে Agdum Bagdum ডিমের ঝোল আর আলু ভর্তা রান্না করল ভাতের সাথে। সন্ধ্যায় আমরা স্পীকারে গান ছেড়ে বার-বি-কিউ করলাম। কিছু চিকেন রেখে দিলাম, কারণ রাতে আবার Agdum Bagdum খিচুড়ি রান্না করতেছে। পুরোটা সময় ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলতেছিল আমরা একটু পরপর হাত পা তে তাপ পোহাচ্ছিলাম। আমার জুতা পুরোই ভিজে গিয়েছিল। আমি তাই লাঠির মাথায় জুতো রেখে জুতো শুকাচ্ছিলাম অনেকক্ষণ ধরে, অনেকটা জুতোর বার-বি-কিউ!

দিনের বেলা সারি ভিলেজের তাপমাত্রা ছিল ২ ডিগ্রী, যেটা রাতে ঘুমানোর পরে -৫ পর্যন্ত নেমেছিল।

২৩.০১ঃ ভয়াবহ একটা দিন! এদিন আমাদের লক্ষ্য অলি। আজ থেকে চার রাত আমাদের বুকিং আছে অলির দুটো হোটেলে। আজ যে করেই হোক অলিতে যেতেই হবে। অলিতে যেতে হলে আগে জোশীমঠ যেতে হয়। সেখানে থেকে অলির রাস্তা এই সিজনে বন্ধ থাকে বরফের কারণে। জোশীমঠ থেকে কেবল কারে করে অলি যেতে হয়, কিন্তু বিকেল সাড়ে চারটার পরে আর কেবল কাল চলে না। তাই আমাদের সাড়ে চারটার আগেই জোশীমঠ পৌঁছাতে হবে।

ভোর সাড়ে ছটায় উঠেই দেখি, সেই তুষার বৃষ্টি তো চলছেই, এখন আবার একটু বাতাসও আছে সাথে! আমরা উপড়ে গিয়ে নাস্তা বানাতে বললাম। ড্রাইভার একটু সামনে গেছে রাস্তার খোঁজ নিতে। আমরা নাস্তা করতে করতেই ড্রাইভার এসে জানাল, এদিক থেকে জোশিমঠের রাস্তা বন্ধ। আমাদের উল্টো রুদ্রপ্রয়াগ গিয়ে অন্য পথে যেতে হবে।

আমরা নাস্তা সেরে ৯টার দিকে বের হলাম। তখনও বেশ ভারী তুষারপাত হচ্ছে। আস্তে আস্তে তুষারের উপর দিয়ে গাড়ী চালিয়ে নিচের দিকে নামতেছি আমরা। ঘন্টাখানেক পর আর তুষার নেই, কিন্তু বৃষ্টি চলছে। রাস্তার অবস্থাও যা তা হয়ে গেছে এক রাতেই। খুব সাবধানে আর আস্তে আস্তে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। ১টার দিকে আমরা আটকে গেলাম কারণ সামনে ল্যান্ডস্লাইড। প্রায় দু ঘণ্টা পর রাস্তা ক্লিয়ার হল। আমাদের সামনের ৩-৪টা গাড়ী পাড় হয়ে গেছে। আমরাও পার হতে না হতেই আমাদের সামনে আবার অনেকটা ধসে পড়ল। এবার আমরা যেখানটায় দাঁড়িয়ে সেখানে পাহাড় থেকে থেমে থেমে ছোটো ছোটো পাথর পড়তেছে। আমরা ঠিক করলাম পিছিয়ে গিয়ে আগের জায়গায় যাব। এই পিছনে নিচ্ছিল, অমনি পিছনেও আর একটা অংশ ধসে পড়ল। এবার সামনে ব্লক, পিছনে ব্লক, মাঝে আমাদের ৫-৬ টা গাড়ী। আমরা গাড়ী থেকে বেরিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলাম আর একটু পরপর পাহাড়ের দিকে তাকাচ্ছি অজানা আশংকায়!

এর মধ্যে আরও ৪টা বুলডোজার এসে রাস্তা ক্লিয়ার করা শুরু করল। তখন এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা হল। তিনি প্রায় ৭ বছর ধরে ওখানে কাজ করছে। উনি জানাল, এই টুকু এলাকায় নাকি সারা বছর অনেক ল্যান্ডস্লাইড হয়। এই পাহাড়টা নাকি স্টাবল করাও যাচ্ছে না। প্রসঙ্গত, পুরো রাস্তায় আমরা অনেক জায়গায় দেখেছি কিভাবে পাহাড় কেটে নিচে পাথর দিয়ে পাহাড় স্টাবল করার চেষ্টা করা হয়। এখন তাদের প্লান হল পাশের নদীকে ডাইভার্ট করে সোজা রাস্তা টেনে নিবে!

রাস্তা ক্লিয়ার হতে আরো দু ঘণ্টা লাগল। আমরা রওয়ানা দিয়ে সন্ধ্যার দিকে রুদ্রপ্রয়াগ পৌছালাম। তখন লাঞ্চ সেরে নিলাম। ওখান থেকে জোশীমঠ আরো ১১০ কিমি। ঠিক করলাম আজ যেহেতু অলি যেতে পারব না, তাই জোশীমঠ গিয়েই থাকব। খেয়েদেয়ে সন্ধ্যার পরে আবার যাত্রা শুরু। পাহাড়ি রাস্তায় রাতে চলা অনেক ভীতিকর। কিন্তু আমাদের তো যেতেই হবে। বেশ ভালোই যাচ্ছিলাম।

রাত তখন ১০.৩০ এর মত। জোশিমঠ থেকে ৫ কিমি আগে। রাস্তার দু পাশে হালকা বরফ আবার দেখা যাচ্ছে। আমরা বেশ গল্প করতে করতেই আপহিল ধরে এগোচ্ছিলাম। গাড়ী তখন ৪০-৪৫ হবে, একটা মোড় ঘুরেই সাঁ করে গাড়ী স্কিড করল, এক চাকা রাস্তার ঠিক বাইরে গিয়ে থামল। পাশেই বিশাল খাদ! আমরা সবাই গাড়ী থেকে নেমে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতেছি। সবাই থ খেয়ে আছি। একটু স্বাভাবিক হয়ে গাড়ী সামনে নেবার চেষ্টা করলাম। সবাই মিলে ধাক্কা দিয়েও তেমন সুবিধা করা গেল না। চাকা স্কীড করেই যাচ্ছে। শেষে ঠিক হল, ড্রাইভার গাড়িতেই থাকবে, আমরা হেঁটে জোশিমঠ যাব। শুধু কাঁধের একটা করে ব্যাগ নিবে, যাতে খুবই জরুরী জিনিসপত্র, যেমন ওষুধ, চার্জার ইত্যাদি। আমাদের ব্যাগে কিছু স্ন্যাক্স ছিল, আমরা সেগুলো ড্রাইভারকে দিলাম রাতে খাবার জন্য।

এরপর আমরা হাঁটা শুরু করলাম। ভয়াবহ ঠাণ্ডা লাগছে তখন। এর সাথে বরফের মধ্যে হাঁটা অনেকটাই কষ্টের। Malay একটা টর্চ নিয়ে এসেছিল বলে একটু উপকার হল। ঠাণ্ডায় আমার মুখে বেঁকে যাচ্ছিল। কথা জড়ানো। আর পা তো অনেক আগে থেকেই অবশ হয়ে আছে। জোশীমঠের আধা কিমি আগে যখন আমরা তখন বিপরীত দিক থেকে একটা বড় লরি ট্রাক এসে আমাদের পাশে থামায়, জানতে চায়। আমরা বলার পরে উনি বললেন, যে সামনে রাস্তার পাশে একটু নিচে তিনটা ভাল্লুক আছে। উনি গাড়ীর হেডলাইটে দেখেছে। আমরা যেন টর্চ বন্ধ না করি, আলো থাকলে ওরা আসে না। এবার আমরা আরো ভয় পেয়ে গেলাম। ওনাকে বললাম, আপনি তো এখানকার লোকাল, আমাদের একটু পার করে দিন সাথে করে। উনি রাজী হলেন। বড় একটা টর্চ নিয়ে আমাদের সাথে করে ঐটুকু পার করে দিলেন। পার করার সময় নিচে লাইট মেরে একটা ভাল্লুক দেখিয়েও দিলেন। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরেই আমরা জোশীমঠের আলোর দেখা পেলাম, আর বুকে পানি ফিরে পেলাম।

জোশীমঠে ঢুকে দেখি কিচ্ছু নেই, সব বন্ধ। রাত তখন ১২টার একটু বেশি। প্রথম হোটেলে ১০ মিনিট ডাকাডাকি করে খুলালাম। সে লোক রুম ভাড়া চাইল ৪৭২০/- প্রতি রুম। হোটেলটা যা-তা। আমরা বললাম, এ তো অনেক টাকা, আমরা আর একটু দেখি। পরের হোটেলে ডাকতে যাবার সময় মলয় শ্লিপ করে পড়ে গেল, আর ওর হাতের ফ্লাক্সটা ভেঙ্গে গেল। আমি বললাম, ওটাতে যেতে নিষেধ করতেছে, পরেরটায় চলেন। পরের হোটেলটা বেশ ভাল ছিল। ৩০০০/- রুম ভাড়া ছিল, সাথে রুম হিটার। কিন্তু খাবার দিতে পারবে না, কারণ কিচেন বন্ধ। আমাদের তখন খাবারের থেকেও বেশি দরকার একটু আশ্রয়। আমরা রুম নিয়ে নিলাম। রুম হিটারে আমার পা ছেঁকে নিলাম। কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়লাম।

২৪.০১ঃ শরীফ ভাই সকাল ৮টায় উঠে গেল কেবল কারের টিকিট কাটতে। গতরাতের অলির হোটেলের টাকা মিস। আজ যেতেই হবে। ওনাকে বললাম, আপনি কেবল কারের গেটে নাস্তা করে নিন, আমরা হোটেলে থেকে নাস্তা করে বের হই। আমরা নাস্তা করে চেক আউট করে গিয়ে শুনি, সকালে রাস্তা এত পিচ্ছিল ছিল উনি নাকি ৬বার স্লিপ করে পড়েছে। যাই হোক, কেবল কারে আমাদের টাইমিং দিল দেড়টা। আমরা ঠিক করলাম জোশীমঠ থেকেই আমরা বরফের জন্য জুতা ভাড়া করে নিব আর আমাদের জুতা এখানে রেখে যাব। সেই মত আমরা জুতা নিয়ে দেড়টায় কেবল কারে উঠলাম।

কেবল কারে মোট দশটা টাওয়ার। যারা নাইট স্টে করবে তারা ৮ নম্বরে নামবে, আর যারা ঘুরতে যাবে তারা দশ নম্বরে নামবে। আমরা চিন্তা করলাম যেহেতু তিনদিন থাকব, আজ ৮ নম্বরে নেমে নেমে যাই। কাল ধীরে সুস্থে দশ নম্বর থেকে ঘুরে আসা যাবে। সেই মত আমরা ৮ নম্বরে নামলাম। নেমে আবার চেয়ার লিফটে করে আরো একটু নিচে নামতে হবে।

কেবল কার এবং চেয়ার লিফট দুটোই অনেক এক্সাইটিং। বিশ মিনিটের কেবল কার উপর থেকে পুরো বরফের সমুদ্র দেখা যায়। যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। চারিদিকে শুধু আর সাদা। চেয়ার লিফট অনেক বেশি এক্সাইটিং। পুরো খোলা, চেয়ারে বসে তিন মিনিটের এক জার্নি – এক কথায় অসাধারণ। চারিদিক এতই সুন্দর যে ভাষায় বলে বোঝানো যাবে না, আসবেনা কোন ক্যামেরার ফ্রেমে।

You may also read:  মেঘালয় - দ্য গ্রীণ ভ্যালী

আমরা গিয়ে আমাদের কটেজে চলে গেলাম। কাঠের ছোটো ছোটো কটেজ, দেখতেও অনেক সুন্দর। আমরা লাঞ্চ করেই আশেপাশে ঘুরতে বের হলাম। তখন জানলাম, আমাদের বাকি দু রাত যে হোটেলে, সেখানে যেতে হলে ৪ কিমি হাঁটু বরফে হেঁটে যেতে হবে। সেটা কোনোভাবেই সম্ভব না। আবার এই কটেজে পরদিন পুরো বুকড। এর মধ্যেই বরফ নিয়ে কিছুক্ষণ দাপাদাপি চলল। সাড়ে তিনটার দিকে হঠাত করে আবার ওয়েদার খারাপ হওয়া শুরু হল। মেঘ করে আসল, সাথে কনকনে বাতাস। তাপমাত্রা তখন মাইনাস ৩ ডিগ্রী। আমি নিজেই একটু টেনশনে পড়ে গেলাম। কাঠের কটেজ যদিও গরম হয় তাড়াতাড়ি, কিন্তু ফাঁকা দিয়ে বাতাস ঢুকবে। এছাড়া আগের রাতের ঝড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। রাতে ৩ ঘণ্টা জেনারেটর দিবে, ঐ টুকু সময় রুম হিটার চলবে।

আমি একবার চিন্তা করলাম, সাড়ে চারটার লাস্ট কেবল কারে ফিরে যাই। পরে সবাই মিলে ঠিক করলাম, পাশেই সরকারি অনেক ভাল একটা রিসোর্ট আছে – GMVN. ওখানে খোঁজ নিয়ে দেখি। তাহলে কটেজে থাকব না। এই ভেবে GMVN খোঁজ নিলাম। ওদের ওখানে রুম পেলাম ৪১২০/- তে। নিয়ে নিলাম। GMVN হোটেল টা বেশ ভাল লেগেছে। ওদের ব্যবহার হতে শুরু করে, রুমে ডবল হিটার। আমাদের বলল, রাতে ৪ ঘণ্টা জেনারেটর দিবে, রুম হিটার চালু রেখে রুম গরম করে রাখতে। আমরা কটেজ ছেড়ে দিয়ে GMVN এ উঠলাম। সন্ধ্যার পরে, টুকটাক গল্প করলাম। ওদের বারে বসে খানিকটা সময় কাটিয়ে, ডিনার সেরে রুমে।

সাড়ে দশটায় জেনারেটর বন্ধ হবার পরেও বেশ আরামেই ছিলাম। তেমন ঠাণ্ডা লাগছিল না। ঘুমিয়ে গেলাম। আমার ঘুম ভাঙল রাত ১টায়, একটা আওয়াজে। মনে হচ্ছে কেউ গেট খুলতেছে বা লোহার কিছু টানছে। আস্তে আস্তে শব্দ বেড়েই চলছে। আমি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বোঝার চেষ্টা করছি কিসের আওয়াজ। ২ টার দিকে শুনলাম, বাতাসের গর্জন। তখন বুঝলাম, আগের আওয়াজ কোন গেটে এসে বাতাস জোরে লাগছিল, তার আওয়াজ। সেই ২টা থেকে ৪.৩০ পর্যন্ত ঝড়ের গর্জন শুনলাম। ঠিক যেমন সিডরের সময় যেমন শুনেছিলাম। আমার মাথায় শুধু একটা মুভির কথা আসছিল তখন – The Day After Tomorrow! মনে মনে ভাবি যে সকালে উঠে যদি দেখি পুরো বিল্ডিং বরফের নিচে? এসম চিন্তা করে আর ঘুমাতে পারছিলাম না।

২৫.০১ঃ ৭টার সময় আলো ফোটার সাথে সাথেই আমি দরজা খুলে পুরাই টাস্কি! আমরা তন তলায় ছিলাম। এক পাশ থেকে দোতলা পর্যন্ত পুরাই বরফ। গতকালের হাঁটার যত নিশান ছিল কিছুই নেই। আর ঘূর্নি বাতাস চলছে। সাথে তুষার তো বেড়েই যাচ্ছে।

৮টার দিকে হোটেলের লোক এসে আমাদের বলল, আপনারা নাস্তা করে নিন, আপনাদের আজ চলে যেতে হবে। কারণ ওয়েদার আরো খারাপ হতে পারে, থাকাটা ঠিক হবে না। কিছু সময়ের জন্য চেয়ার লিফট এঁর কেবল কাড় ওপেন করবে, যাতে আমরা চলে যেতে পারি। আমরা নাস্তা করে রেডি হয়ে বসে আসি, আর ভাবছি প্রকৃতির কাছে আমরা কতটা অসহায়। প্রকৃতি রাগ হলে কতটা নির্মম হতে পারে! তখন জানলাম রাতে নাকি মাইনাস ১৫ ডিগ্রী ছিল।

১১টার দিকে আমাদের ডেকে নিয়ে গেল যে সব ওপেন হয়েছে। অলিতে ঐ রাতে ৩০-৩৫ জন ছিল। সবাইকে চেয়ার লিফটে করে পাঠানো হবে। এদিকে একটা টিম দূরে কোথায় যেন ২৫ জন ট্রেকার আটকা পড়েছে, তাদের আনতে যাবে। আর দু মিনিট বিরতি দিয়ে দিয়ে ঝড় হয়েই যাচ্ছে। আমরা শুধু কোন রকমে অলি থেকে বেড় হতে পারলে বাঁচি। এর মধ্যে নিচে বরফ জমার কারণে লাফিয়ে লাফিয়ে রানিং চেয়ার লিফটে উঠতে হয়েছে। চেয়ার লিফটের ৩ মিনিটেও ২ বার তুষার ঝড় শরীরের উপর দিয়ে গেছে। আমি তো আবার কথা বলতে গেলেই মুখ বয়েকে যাচ্ছে। কোন রকমে হ্যান্ড গ্লাভস দিয়ে মুখ চেপে আছি, কিন্তু তাতে তেমন কাজ হচ্ছে না আসলে।

চেয়ার লিফট থেকে নেমে কেবল কারের জন্য ওয়েট করতে হল ১০ মিনিটের মত। ঐ ১০ মিনিট জীবনের সব চেয়ে দীর্ঘ ১০ মিনিট। ২০১৩ সালে একবার প্লেনে বসে ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলাম। তখন যেমন ভয় পেয়েছিলাম, এদিন ও ঠিক তেমন ভয় পেয়েছিলাম!

কেবল কারে করে জোশীমঠ এসে একটু শান্তির নিশ্বাস পেলাম। কিন্তু হাতে সময় কম, প্রচন্ড মেঘ করে এসেছে, আমাদের দ্রুত এখান থেকে বের হতে হবে। না হলে আবার রাস্তা বন্ধ হলে বিপদ। এদিকে ড্রাইভারকে আগেই জোশীমঠ হোটেলের ঠিকানা বলে দিয়েছিলাম। সে দিনের বেলা গাড়ী নিয়ে এসে এখানে ছিল। আমরা ঐ হোটেল থেকেই লাঞ্চ করেই বের হয়ে গেলাম।

রাতে এলাম রুদ্রপ্রয়াগ। সেখানে এসে জানলাম অলি নাকি দুই দিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। ওখানে একটা হোটেল নিয়ে সে রাতটা কাটিয়ে দিলাম।

২৬.০১ঃ এদিন একটু রিল্যাক্সে শুরু করলাম হরিদ্বার ফেরা। সবার চোখে মুখে স্বস্তি। তবু আগের দিনের ভয়াবহতার রেশ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়ছিল না। শেষ বারের মত আবার আঘাত দিল। বিকেল ৪টার দিকে, হৃষীকেশ এর ২২ কিমি আগে রানিং গাড়ীর সামনের চাকার ব্রেক ডিস্ক খুলে পড়ে গেল। ভাগ্যিস ড্রাইভার এবং আমরা টের পেয়েছিলাম, উনি স্পীড ধীরে কমিয়ে এনে গাড়ী সাইড করল। এর পর অন্য একজনের বাইকে চড়ে হৃষীকেশ গেল ডিস্ক কিনতে আর মেকানিক আনতে। ফেরার সময় একটা ট্রাকে লিফট নিয়ে কিছুদূর এল, এবং পরে প্রায় ৪ কিমি হেঁটে এসেছে। ততক্ষণ আমরা ওখানে বসে ঝিমালাম, পাহাড় থেকে নুড়ি পাথর গড়িয়ে পড়া দেখলাম। মেকানিক এনে গাড়ী ঠিক করতে করতে প্রায় চার ঘণ্টা লাগল মোট। রাতে মোবাইলের আলো দিয়েই মেকানিক ছেলেটা ডিস্ক লাগাল। সাড়ে আটটার দিকে আমরা আবার রওয়ানা দিয়ে ১০টার দিকে হরিদ্বার গেলাম। গিয়েই সোজা হোটেলে ঢুকেই সবাই ঘুম।

২৭.০১ঃ এদিন লাঞ্চ করে আমরা আবার হৃষীকেশ গেলাম। কারণ রাতের বেলা রাম ঝুলা – লক্ষণ ঝুলা ব্রিজে খুবই সুন্দর লাইটিং করে, দেখতে খুবই ভাল লাগে। এবার হাতে যেহেতু একটু সময় ছিল, আমরা অনেক ভাল করে ইয়োগা গ্রাম ঘুরলাম। রাম ঝুলার পাড়ে একটা দোকান থেকে আমি ট্যাটু করলাম। ৮টার দিকে ওখান থেকে ফিরে হোটেলে এসে গাড়ী ছেড়ে দিলাম।

ড্রাইভার ও বলল তার এক ট্যুরে এতগুলো দুর্ঘটনা জীবনে ঘটেনি, আমাদেরও হয়নি এমন কখনো। নিশ্চয়ই সবাই অনেক ভাল মানুষ ছিল বিধায় প্রতিবার বেঁচে গেছি।

ঐ দিন রাত ১২টার দিকে চেক আউট করে ১২.৪৫ এর ট্রেনে দিল্লী ফিরলাম।

২৮.০১ঃ ভোর ৫টায় দিল্লী নেমে একত্ব হোটেল নিয়েই একটা ঘুম দিলাম। ১১ টার দিকে উঠে, বাইরে হালকা কিছু কেনাকাটা করে বিকেলের ট্রেনে কলকাতা।

২৯.০১ঃ ১১ টার দিকে শিয়ালদহ নেমে সোজা এয়ারপোর্ট। বিকেলের ফ্লাইটে ঢাকা।

যে ঢাকা কে সারা দিন রাত এত গালি দেই, জীবনে দ্বিতীয় বারের মত ঢাকায় পা দেবার পর মনে হল, আমি বোধহয় ঢাকার চেয়ে ভাল আর কোথাও থাকব না। বড় মায়াবী এই শহর!

দিল্লি/আগ্রার এলবামঃ www.facebook.com/bappi.d.great/media_set…

বরফের কিছু ছবি নিয়ে এলবামঃ www.facebook.com/bappi.d.great/media_set…

উত্তরাখণ্ড এর বাকি অংশের এলবামঃ www.facebook.com/bappi.d.great/media_set…

এবং www.facebook.com/bappi.d.great/media_set…

পুরো ট্যুরের জন্য কোলকাতার শরীফ ভাইকে আলাদা করে ধন্যবাদ দিতেই হয়। লোকটা না থাকলে আসলেই অনেক অসুবিধায় পড়তাম। যেকোনো রকম প্রবলেম হলেই উনিই সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। উনি না থাকলে আমাদের আসলেই অনেক কষ্ট হত। শ্বশুরবাড়ী আবার যখন আসবে ওনার একটা ট্রীট পাওনা আমার কাছে 🙂

Leave a Reply